Art & Culture

এক অলীক প্রেমিক প্রেমিকার কথোপকথন ( A short story: Imaginery dialogues of a couple)

Drawing by Malay Sarkar

Malay Sarkar

Kolkata, November 15, 2019: অন্য দিনের মতন দুজন প্রেমিক প্রেমিকা তাদের প্রিয় শিমুল গাছ তীর নিচে এসে বসলো। আধশোয়া প্রেমিকের বুকে মাথা রেখে প্রেমিকার চোখ তখন প্রেমিকের চিবুকের দিকে, আর প্রেমিক তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে চলেছে:

প্রেমিক: একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
প্রেমিকা : বলো।
প্রেমিকা : এই যে আমাদের রোজরোজ দেখা হয়,কত
কথা হয়, তবুও কথা ফুরিয়ে যায় না কেন
বলতো?

প্রেমিকা: কথার বাঁধনে বাঁধা পড়েছে দুটো জীবন তরী
উজান এখন অনে-ক দূরে চুপ থাকা যায় থুড়ি

প্রেমিক: এটা কিন্তু উত্তর হলো না ।
আচ্ছা বেশ তাই সই , তা এই উজানটা কি? আর কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ?

প্রেমিকা: উজান! যেখানে দুজনের আত্ম উপলব্ধি হবে দুজনের মধ্যে , সেখানে তোমার আমার ব্যক্তিগত জাগতিক ভালোমন্দের অবসান হয়ে অনাবিল আনন্দ স্রোতে ভেসে যাব আমরা। আর আঁকা বাঁকা কিনা তা তো জানি না । তোমাকে নিজের মধ্যে পেতে ইচ্ছে করে । যদি জানতে চাও কিভাবে? বলবো সমস্ত চেতনা দিয়ে ।

প্রেমিক: সে তো বুঝলাম, তোমাকেও তো পেতে ইচ্ছে করে আমার সারাক্ষন। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর তো এখনো পেলাম না। দুজন নাহয় ভাসলাম সারাদিন, স্বপ্ন উজানে, মনের দরিয়ায়, কিন্তু কথার স্রোত সেখানে আসে কিকরে?

প্রেমিকা: তুমিই বলো, আমার জানা নেই.

প্রেমিক: ধরো গিয়ে সারাদিন তো অনেক লোকের সঙ্গেই আমরা বকবক করি, কখনো বন্ধুর সকথে, পরিবারের সাথে, কাজের লোকের সাথে, এমন কি বাস ট্রাম এ কন্ডাক্টর, ভীড়ে পাশে দাঁড়ানো লোকটার সাথে, দোকানির সাথে, অটোর ড্রাইভারের সাথে, এমনি আরো কত লোকের সাথে, আমাদের তো কথার ভান্ডার শেষ হয়ে যাওয়ার কথা, তবু দুজন মুখোমুখি হলেই কথা গুলো খইয়ের মতন ফুটতে থাকে। কেন?

প্রেমিকা: জানি না দরকার কি জানার ?এটাই তো বেশ।

প্রেমিক: তার ওপর ফেসবু,ক হোয়াটস্যাপ এসব তো আছেই। এই যে বুদবুদের মতন কথা বেরোয়, কোথা থেকে, আর কেনই বা বের হয়? আর কত কথা জমা আছে আমাদের?

প্রেমিকা : জানি না এত !
প্রেমিক :জানিনা বললে ছাড়ছে কে তোমাকে।

প্রেমিকা: তোমার কাছ থেকে তো ছাড়া পেতে চাই না।

প্রেমিক: এমনি বললে হবে না।

প্রেমিকা: যা জানি না তা কেমন করে বলবো? তাছাড়া কথা ফুরোবে সেটা আমি চাই না.

প্রেমিক: এখন যদি প্রশ্ন করি কতটা ভালোবাসো আমায়? তখন তো দিব্বি বলতে পারবে ওই নীল আকাশের মতন, তাহলে এখন প্রশ্নের উত্তর দিতে
পারবে না?

প্রেমিকা: কথা দিয়ে যে তোমাকে ছুঁই আমি আর তুমিও….

প্রেমিক: হু…সে তো আমিও ছুঁই তোমায়, কিন্তু অনন্ত এই কথা আসে কোথা থেকে? আচ্ছা ধরো যদি দুজন সারাদিন একসাথে থাকা শুরু করি, তখন কি বেরোবে এত কথা?

প্রেমিকা: তোমার সঙ্গে যখন কথা বলি মনে হয় তুমি আমার পাশে, যা যা আমার মনে হচ্ছে সব তোমাকে বলি। এখন অতশত বলতে পারবো না। যখন তোমাকে দেখব, চোখের দিকে তাকিয়ে অনুভব করব।

প্রেমিক: ব্যস্ , তাহলে মানে এইটাই দাঁড়ালো যে আমরা যখন দুজন দূরে থাকি, কিংবা কাছে থেকেও মাঝখানে দূরত্ব থাকে তখন কথাগুলো নিজে থেকে বেরিয়ে এসে দুজনের মনকে জুড়ে দেয়।

প্রেমিকা: তা তো বটেই! কাছে থাকি না বলেই তো কথার সেতু। কাছে থাকলে অন্যরকম হতো.

প্রেমিক: প্রশ্ন কিন্তু থেকেই গেল আসে কোথা থেকে এতো কথা?

প্রেমিকা: তোমার কথা, গলার স্বরে আমি বুঝি তোমার ক্লান্তি, ব্যস্ততা, আনন্দ, বিরক্তি।

প্রেমিক:বেশ কিন্তু তা শেষই বা হয়না কেন?

প্রেমিকা: এত কথা কি তবে অনুভূতি থেকে আসে?

প্রেমিক: বেশ বললে কিন্তু কথা কি তবে আবহে অনুভূতিতে থেকে? আচ্ছা অনুভূতিগুলো কি গাছের মতন? ডালপালা বের করা? কথাগুলো কি শুকনো পাতার মতন? এলে আপনি ঝরে পড়ে? অথবা কি হওয়ার সাথে ঝরে পড়ে?

প্রেমিকা: না না, অবশ্যই তা নয়। শুকনো পাতার মতো হলে সম্পর্ক শুকিয়ে যেতো।

প্রেমিক: তবে কি কথাগুলো পাকা ফলের মতন, ডাল থেকে ঝুলে থাকে, তারপর টুপ্ করে ঝরে পড়ে, ভেতরে থাকে অনুভূতির বীজ?

প্রেমিকা: উঁহু অনুভূতিগুলোই শব্দবিস্তার করে, যেমন আমার অনুভূতিগুলোই তোমার কাছে পরিবাহিত হয়। উফফফফ্! এত ভাবিনি কখনো।

প্রেমিক: এই দেখ ভাবতে হয় বইকি!

প্রেমিকা: ধ্যাত, খালি কথার মারপ্যাঁচ!

প্রেমিক: ভাবো তো আমরা দুজন আর মাথার ওপর একটা চাঁদ…..

প্রেমিকা: আমি অতশত ভাবতে পারবে না

প্রেমিক: ভাবো তখন তোমার মুখ থেকে কি কথা বেরোবে? তখন কি তুমি বলবে? তুমি শুয়ে পর ঘাসের গালিচায়, আমি তোমার চন্দ্রিমা হই।

প্রেমিকা: দেখো বাপু তোমার কথা না শুনলে আমার সকাল সন্ধ্যে থমকে থাকে। এটাই সত্যি। কারণ আমি তোমাকে ভালবাসি । তাই এত কথা বলি আর শুনি কেবলমাত্র তোমাকে পাবার জন্য ।

প্রেমিক: চাঁদের আলোর মতন কখনো আমার ডান পাশে, কখনো বাম পাশে, লুকোচুরি খেলবে কি তখন তুমি?

প্রেমিকা: তখন আমি কোনো কথা বলবো না। তোমার হাতে হাত রেখে তোমাকে অনুভব করব জোছনা মেখে। তখন চুপ থাকাটাই কথা। এবার থামো তো!অনেক হয়েছে ।

প্রেমিক: বেশ তখন কথা গুলো তোমার চোখের তারায় ভাসবে, ঠোঁটের কোণে হাসি হয়ে নেমে আসবে আমার ঠোঁটে।

প্রেমিকা: উমমমম্ !তখন চন্দনরঙা জোছনা লুটিয়ে পড়বে দুজনের শরীর জুড়ে, নদীর রূপালি জল মোহময়ী …
প্রেমিক: সেটা বুঝলাম, কিন্তু এখনো অজানা রয়েই গেল, আসে কোথা থেকে কথা গুলো?

প্রেমিকা: ভালবাসা থেকে!

প্রেমিক: এই, এই এতক্ষনে একদম ঠিক বলেছ। এইটাই জানতে চাইছিলাম।

প্রেমিকা: অসভ্য!

প্রেমিক: তার মানে ভালোবাসা, রাগ, অভিমান, দুঃখ কষ্ট, সুখ ,আনন্দ – এগুলোই কথার উৎস। তাই কথা দিয়ে আমরা আবেগগুলোকেই বুঝতে পারি। দেখো দেখি তুমি নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলে।

প্রেমিকা: মাস্টারমশাই, ঠোঁটটা কাছে আনো। সব কথার শুনবো আর সব প্রশ্নের উত্তর নেবো।

প্রেমিক: এভাবে বুকের ওপর শুয়ে থাকতে থাকতে তো ঘুমিয়ে পড়ব দুজন মিলে।

প্রেমিকা: উমমমম্

প্রেমিক: তার চেয়ে বরং চলো, চাঁদের আলো গায়ে মেখে দুজন উঠে পড়ি.

প্রেমিকা: খুব ইচ্ছে করে জানো আজ সারাদিন থাকি তোমার সাথে আর চুপকথারা ভীড় করুক দুজনের মাঝে ।

প্রেমিক: সামনের রাস্তাটা দেখো চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে

প্রেমিকা: উমমমম্ ,চোখ বুজে দেখছি সামনে জোৎস্না ধোয়া রাস্তা,

প্রেমিক: দেখো কেমন এঁকেবেঁকে চলে গেছে সুদূরে, দিগন্তের পারে।

প্রেমিকা: দুদিকে সবুজ পাহাড়ের গা গড়িয়ে নামছে রূপালি ঝর্ণা। চারিদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে চাঁদের আলোর মখমল।

প্রেমিক: চল যাই সেখানে ….

আলো আঁধারিতে মিলিয়ে গেল দুটো পার্থিব শরীর অপার্থিব অনুভূতির খোঁজে …….



Most Popular

 

 

More Posts
To Top