Art & Culture

ফাগে রাঙা বাহা পরব

Baha Festival of Santhals
Photo courtesy: http://kherwalsantal.blogspot.in/2011/10/santali-dance-forms.html

Paramita Gharai

February 23, 2018:

চাঁদের আলো গলে নামছে কোপাইএর জলে, পৌষালী রিক্ততার দৈন্যতা কাটিয়ে পলাশের ডাল লাল টুকটুকে, রাঢ় বাংলার রাঙামাটিতে লাল-কমলা-হলুদ-গোলাপী ফুলেরা গা ঘেষাঘেষি করে দোল খাচ্ছে দক্ষিণের হাওয়ায়। মনোমোহিনী বসন্তর রঙে আমাদের মন ও  রঙিন।

দেশের প্রতিটি আনাচেকানাচে সে রঙেরই ছোঁয়া।  ভারতে রঙের উৎসব ‘হোলি’, বাংলার বুকে ‘দোলযাত্রা’,  রবি ঠাকুরের তীর্থভূমি শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব। ”ওরে গৃহবাসী,খোল দ্বার খোল লাগল যে দোল” – কলাপাতায় রাখা ফাগের আবির দিয়ে কপালে এঁকে দেওয়া হয় বাসন্তী শুভেচ্ছা। বসন্তোৎসবের সূচনা কবিতীর্থে।

রাঢ় বাংলার মাটিতে তার আগের রাতেই বেজে ওঠে ”বাহা পরব”এর ধামসা-মাদল। ব্রজগোপী বৃন্দাবনের মাটিতে কবে হোলির রঙে রাধিকাকে  রাঙিয়েছিলেন জানা নেই, তবে ”বাহা পরব” এর রাতে মহুল ফুলের গন্ধে যখন বনাঞ্চল আবেশিত,যখন শাল ফুলের সাজে জোৎস্না রাত সুসজ্জিত, তখন ফুলের দেবতা ”জাহের” এর থানে চালা বাঁধে সাঁওতাল পুরুষ। গোবর দিয়ে নিকানো হয় মন্দিরের আঙিনা। দলবেঁধে শিকারে যায় সাঁওতাল পুরুষেরা। সন্ধ্যেবেলায় ‘নায়েক’ অর্থাৎ পুরোহিতের বাড়িতে সমবেত হয় সবাই। কয়েক দিন ধরেই নায়েকের মানসিক প্রস্তুতি চলে নিষ্ঠাভরে পুজো করবার জন্য। নায়েক দেবতা জাহের কে নিবেদন করেন নতুন বসন্তের নতুন ফুল ,নতুন পাতা।

ভারতের আদি জনগোষ্ঠী সাঁওতালদের বাস ছিল বনভূমিতে। অরণ্যই তাদের আশ্রয়,আচ্ছাদন,খাদ্যের যোগান দিয়ে এসেছে।বনের ফল যেমন তাদের ক্ষিদের অবসান ঘটিয়েছে,বনের ফুল তেমনি আরো মোহময়ী করেছে সাঁওতাল রমণীর রূপকে। বৃক্ষ তাই এই জনগোষ্ঠীর কাছে দেবতা। বৃক্ষদেবতা তথা বনভূমিকে পুজোর মধ্যে দিয়েই সাঁওতালিদের নতুন বছরের সূচনা।শীতের অবসানে রিক্ত বনভূমি যখন সবুজ হয়ে ওঠে বসন্তের আলিঙ্গনে,শাল গাছে আসে নতুন ফুল,ইচা-মহুয়া ফুলের বাহারে যখন রাঢ়ভূমি নবযৌবনা,ঠিক তখনই হয় বাহা পরব।।

সাঁওতালি ”বাহা” কথার অর্থ ফুল।ফাল্গুনী পূর্ণিমার চাঁদকে সাক্ষী রেখে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে আলিঙ্গন করার উৎসবই কি ”বাহা পরব”?

দেবতা জাহেরকে নিবেদন না করে সাঁওতাল পুরুষ অরণ্যের ডাল ভাঙে না, সাঁওতাল নারী মাথায় দেয় না শালফুলের সাজ। আমের মঞ্জরী, পিপুল গাছের ডাল কোনোকিছুতেই হাত দেবার অনুমতি থাকে না সাঁওতাল সম্প্রদায়ের।   প্রকৃতিকে সম্মান করে  নায়েক দেবতা জাহের এর কাছে প্রার্থনা করে ফসলপূর্ণা আগামী বছরের। ফুলের দেবতা জাহের এর সাথে  পূজিত হন প্রধান দেবতা ”মারংবুরু” এবং অঞ্চল রক্ষাকারী দেবতা ”পরগনা বঙ্গার”।এরপরেই ইচাক-মুরুপ-সারজাম বাহাকে স্পর্শ করবার অধিকার পায় সবাই।ফাল্গুন মাস সাঁওতালি বছরের প্রথম মাস।  প্রকৃতির  ঊর্বরা শক্তিকে প্রণাম জানাতেই এই আদি জনগোষ্ঠীর বাহা উৎসব। আদি এই জনজাতি  বিস্মৃত অতীত সময় থেকেই ধরে আরাধনা করছে  প্রকৃতিকে। আদিম মানুষের আবেগ,ভালবাসা আর শ্রদ্ধা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়  বাসন্তিকার এই  আবাহনী উৎসবে।

”রিত রিতি রাংকিলো তিঞগোরে মুদাম দ
রিত রিতি রাংকিলো জাহাঞরে নিয়ুরা।”

-চমৎকার আমার হাতের আংটি,সুন্দর আমার পায়ের নুপূর।

পুজোপর্বের শেষে বেজে ওঠে ধামসা। মাদলের বোলে দুলে ওঠে সাঁওতাল রমনীর কোমর। সারি বদ্ধ ভাবে পরস্পরকে ধরে চলে মাদলের তালে তালে নাচ। চলে হাড়িয়া পান,সমবেত ভোজনপর্ব। ফাল্গুনী পূর্ণিমার সাদা চাঁদ তখন রঙ ছড়াচ্ছে প্রকৃতিতে ,তোমার -আমার মনোবাসরে দ্রিমি দ্রিমি মাদলের বোলে বাসন্তিকার আনাগোনা।

Click to comment

You must be logged in to post a comment Login

Leave a Reply

To Top